ঐতিহ্যবাহী পরিবেশ বান্ধব তালগাছ

0
390

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী পরিবেশ বান্ধব তালগাছ

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা, “তালগাছ, এক পায়ে দাড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উকি মারে আকাশে।” আমাদের দেশের পরিবেশ বান্ধব এই তাল গাছ আজ বিলুপ্ত প্রায়। এক সময় সারা বাংলার গ্রাম গঞ্জে, প্রায় প্রতিটি ভিটা বাড়ী থেকে শুরু  করে আনাচে কানাচে, রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধ ভাবে দাড়ানো তাল গাছের নয়নাভিরাম দৃশ্য চোখে পরতো। কালের পরিক্রমায় বাঙলার ঐতিহ্যের অংশ তাল গাছের অস্তিত্ব আজ সংকটা পূর্ন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাল গাছ আস্তে আস্তে হারিয়ে যাওয়ার কারণে এ প্রজম্মের লোকেরা অনেকটা তাল গাছের বৈশিষ্ট, উপকারিতা ও তাল ফলের স্বাদ ভুলতে বসেছে।

কয়েক বছর আগেও বাজারে প্রচুর তাল বিক্রি হতো। জৌষ্ট, আষাঢ় মাসে কাচা তাল ফলের শাস খেতে চারিদিকে ডাক পরে যেত। চলতো শাঁস খাওয়ার প্রতিযোগীতা। কে কত খেতে পারে। শ্রাবণ ভাত্র মাসে পাকা তালের মৌ মৌ গন্ধে মুখরিত হয়ে উঠতো প্রতিটি পাড়া মহল্লা। পাকা তালের আটি পিষে হলুদ রস বের করার জন্য শষে যেত বাড়ীর ঝি বউয়েরা। শ্রাবণ মাসে কলাপাতায় তালের পিঠা তৈরীতে ধুম পরে যেত। শুধু তালের পিঠাই নয়, তালের রুটি, তালের বড়াও তালসত্ব সহ আরো বাহারী অনেক রকম পিঠা। মেহমানদারীতে সকল পিঠা ছিল স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়।

প্রকৃতির কি বিধান একটি তালগাছ থেকে দৈনিক তিনবার সকাল. দুপুর, বিকাল রস পাওয়া যায়। তালের কাচা সর সেবনে মনে প্রশান্তি আনে। প্রতি বৎসর তাল গাছে ফল আসার সাথে সাথে রস সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গাছে উঠা নামার জন্য গাছের সাথে খাড়া করে বাঁশ বেধে নেওয়া হয়। গাছিরা দৈনিক অন্তত তিনবার প্রতিটি তালের ছড়ার অগ্রভাগ একটু একটু করে কেটে অতিযন্তে রস সংগ্রহ করে থাকে। তালের রস থেকে তৈরী হয় তালের পাটালি গুড়। তালের গুড় খুব সুস্বাদু। এছাড়া তাল মিস্ত্রী কফ ও কাশির মহা ঔষধ হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

তাল গাছের সব অংশই প্রয়োজনীয়। তাল গাছের পাতার সাহায্যে নানা রকম হাত পাখা তৈরী হয়। যাহা গ্রীষ্মকালে গরমের উত্তাপে এনে দেয় প্রশান্তির হিমেল হাওয়া। এছাড়া তাল পাতা দিয়ে টুপি তৈরী হয়। কুটির শিল্প কাজে ও তাল পাতা ব্যাবহার হয়ে থাকে। তাল পাতা চাটাই ও মাদুর তৈরীতে ভূমিকা রাখে। তাল পাতার উপরে হাতে খড়ি দেওয়ার বিষয়টি খুবই উল্লেখ্যযোগ্য। তাল পাতা ঘরের চাল তৈরী ও বেড়া নিমার্নে ব্যবহার হয়। তাল গাছের পাতার সাথে সুপরিচিত বাবুই পাখির সুনিপুন ভাবে তৈরী পাতার সাথে ঝুলানো বাসা (আশ্রায়স্থল) সকলের পরিচিত। আজাকালকার হাজার হাজার পাখীর কিচির মিচির ডাক আর মনোরম দৃশ্য চোখে পরে না। তাল গাছের কাঠ খুব শক্ত বিধায় ঘরের কাজও নৌকা তৈরীতে ব্যবহৃত হয়।

তাল গাছ এক বীজ পত্রী উদ্ভিদ। শাখা প্রাশাখাবিহীন এক পায়ে দাড়িয়ে থাকা অন্যতম দির্ঘ্য এই গাছের মাধ্যমে পাড়া, মহল্লা ও বাড়ীর পরিচয় পাওয়া যেত। তাল গাছ ৬০/৭০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এর জীবন কাল প্রায় ১০০/১৫০ বছর। গ্রাম বাংলার মাটি তাল গাছের উপযোগী। অন্যান্য গাছের মত তাল গাছের পরিচর্যার প্রায়োজন হয় না। তবে তালের বীজ রোপন করার পর হেফাজত করার ব্যবস্থা রাখতে হবে। সাধারণত বাড়ীর আইল, অনাবদী জমি, খাল নদীর পাড়, ও রাস্তার দু’পাশে লাগনো যায়। সৌন্দয্য বর্ধনের জন্য সারিবদ্ধ ভাবে লাগানো উচিত। তাল গাছ মাটির ক্ষয়রোধ ও নদী ভাঙ্গণ প্রতিরোধ করে। তাল গাছের শিকড় মাটি কামড়ে ধরে থাকে। ফলে ঝড় বন্যায় গাছ উপড়ে ফেলতে পারে না।

গ্রাম গঞ্জে এমনও একটি প্রচলিত কাব্য আছে শালিস মানি কিন্তু বড় তাল গাছটা আমার। একথার মাধ্যমে তাল গাছের গুরুত্বকেই বুঝানো হয়েছে। জনশ্রুতি আছে যে, তাল গাছের মত বড় বড় গাছে বজ্যপাত হতো। ফলে মাট ঘাটে প্রানিকুলের জীবন রক্ষা পেতো। বর্তমানে জলাবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতি হয়ে উঠছে বিরাগভাজন। সময় মত বৃষ্টি না হওয়া ,আবার অতিবৃষ্টি, কালো মেঘের বর্জ্রপাতে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। বর্জ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা এত বেশী যাহা ভাবিয়ে তুলছে। এ অবস্থায় তাল গাছ রোপন, হেফাজত ও রক্ষায় প্রয়োজন যথাযথ ও কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here